মার্কিন শুল্কের প্রভাব

চীনা কারখানায় ধীর হচ্ছে উৎপাদন, বাড়ছে কর্মীদের ছুটি

মার্কিন নতুন শুল্কনীতিতে সর্বজনীন কিছু ধারা থাকলেও এর মূল লক্ষ্য চীন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায় বিষয়টি বারবারই উঠে এসেছে।

মার্কিন নতুন শুল্কনীতিতে সর্বজনীন কিছু ধারা থাকলেও এর মূল লক্ষ্য চীন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের কথায় বিষয়টি বারবারই উঠে এসেছে। এ শুল্কনীতির প্রভাবে এরই মধ্যে এশিয়ার দেশটি থেকে বিভিন্ন পণ্যের ক্রয়াদেশ লক্ষণীয়ভাবে কমে গেছে। এফটির প্রতিবেদনে দেখা যাচ্ছে, সপ্তাহ কয়েকের মধ্যে চীনা কারখানাগুলো উৎপাদন কমিয়ে এনেছে। কিছু ক্ষেত্রে কর্মীদের সাময়িক ছুটি বা নতুন চাকরি খোঁজার কথা বলছে কোম্পানিগুলো।

জো বাইডেনের সময় থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের বাণিজ্যনীতির কারণে চাপের মুখে রয়েছে চীন, সঙ্গে অভ্যন্তরীণ অর্থনৈতিক ধীরতা তো রয়েছেই। কিন্তু ট্রাম্পের আরোপিত শুল্ক আগের সব বাণিজ্য বাধাকে ছাড়িয়ে গেছে। এখন অধিকাংশ চীনা পণ্যকে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবেশে ১৪৫ শতাংশ বা কোনো কোনো ক্ষেত্রে আরো বেশি শুল্ক দিতে হচ্ছে। কয়েকজন চীনা কারখানা মালিক বলছেন, মার্কিন আমদানিকারকরা ক্রয়াদেশ বাতিল বা স্থগিত করায় উৎপাদন কমাতে বাধ্য হচ্ছেন তারা।

যুক্তরাষ্ট্রের অন্যতম শীর্ষ বাণিজ্য অংশীদার চীন। গত বছর ১৫ শতাংশ চীনা রফতানির গন্তব্য ছিল দেশটি। কিন্তু এফটিকে দেয়া একাধিক সাক্ষাৎকার ও সামাজিক মাধ্যমের ডজন ডজন পোস্ট বর্তমান প্রেক্ষাপটে সে জমজমাট বাণিজ্যের বিপরীত চিত্র তুলে ধরেছে। ডিজিটাল প্লাটফর্মে কর্মীদের আপলোড করা ছবিতে উৎপাদন বন্ধ বা স্থগিতের বিজ্ঞপ্তি বলে দিচ্ছে মার্কিন শুল্ক কীভাবে এশিয়ার বৃহৎ অর্থনীতির ওপর প্রভাব ফেলছে।

অনেক চীনা কর্মী জানিয়েছেন, বাণিজ্যযুদ্ধের ফলে জুতার সোল, জিন্স, বিদ্যুচ্চালিত যন্ত্র ও পোর্টেবল চুলা তৈরির কারখানাগুলোয় উৎপাদন এক সপ্তাহ বা আরো বেশি সময়ের জন্য স্থগিত হয়েছে। কিছু কারখানা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা বা ছুটির দিনে কাজের সূচি বাদ দিয়েছে।

শেনজেন ক্রস-বর্ডার ই-কমার্স অ্যাসোসিয়েশন দুই হাজারের বেশি চীনা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিত্ব করে। সংগঠনটির প্রেসিডেন্ট ওয়াং শিন জানান, সদস্যদের মাঝে চরম উদ্বেগ দেখা যাচ্ছে। তারা কারখানা ও সরবরাহকারীদের ডেলিভারি বন্ধ বা বিলম্ব করতে বলেছে। ফলে কিছু কারখানা এক-দুই সপ্তাহের জন্য উৎপাদন স্থগিত করেছে।

কারখানায় কর্মী সরবরাহ করেন গুয়াংডং-ভিত্তিক এমন তিন নিয়োগদাতা বলেন, অনেক কারখানা অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা বা ছুটির দিনে কাজ বন্ধ রেখেছে। বিশেষ করে মার্কিন ক্রয়াদেশের ওপর বেশি নির্ভরশীল কারখানাগুলো পুরো উৎপাদন বন্ধ রাখছে।

ফুজিয়ান প্রদেশে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্লাস্টিক কারখানার এক কর্মী বলেন, ‘হঠাৎ করে আমাদের রফতানি ক্রয়াদেশ শূন্য হয়ে গেছে। তাই কারখানা সাময়িকভাবে বন্ধ করে দেয়া হয়েছে।’

ডংগুয়ানের ডেহং ইলেকট্রিক্যাল প্রডাক্টসের কর্মীদের সম্প্রতি ন্যূনতম মজুরিতে এক মাস ছুটি দেয়া হয়েছে। কারখানার ঊর্ধ্বতনরা বলছেন, গ্রাহকরা ক্রয়াদেশ স্থগিত করায় আমরা তাৎক্ষণিক চাপে রয়েছি। এ পরিস্থিতিতে সমাধান খুঁজতে কোম্পানি কাজ করছে। এর মধ্যে নতুন বাজারে প্রবেশ ও অপ্রয়োজনীয় খরচ কমানোর চেষ্টা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, যাতে কোম্পানি যত দ্রুত সম্ভব স্বাভাবিক কার্যক্রমে ফিরতে পারে।

মার্কিন বাজারের জন্য এন্ডোস্কোপি কিট তৈরি করে ঝেজিয়াং প্রদেশের হ্যাংজু স্টেলারমেড। প্রতিষ্ঠানটি চলতি মাসের বাকি সময়ের মধ্যে পূর্ণকালীন কর্মীদের নতুন কাজ খুঁজতে বলেছে। এ বিষয়ে কারখানার মালিক শি বলেন, ‘আমরা জানি না এ অবস্থা কতদিন চলবে। এখন শুধু অপেক্ষা করতে পারি, আর কিছু করার নেই।’

প্লাস্টিক মোল্ড প্রস্তুতকারক ডংগুয়ান ইউয়ানগুয়ান ছুটির দিনের অতিরিক্ত কাজ বাতিলের কথা জানিয়ে বিজ্ঞপ্তি দিয়েছে। তবে অনেক কোম্পানির মতো মালিকপক্ষ এ বিষয়ে মন্তব্যের অনুরোধে সাড়া দেয়নি।

ঝেজিয়াংয়ের ২৬ বছর বয়সী এক কর্মী জানান, তিনি খেলনা কারখানায় কাজ করেন, যার বেশির ভাগ পণ্যের গন্তব্য যুক্তরাষ্ট্র। এ কারণে দুই সপ্তাহের জন্য কারখানা বন্ধ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই ব্যক্তি বলেন, ‘সময় এখন ভালো নয়।’

চীনের শিল্পোৎপাদন ও শ্রম পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করেন চায়না লেবার বুলেটিনের প্রতিষ্ঠাতা হান ডোংফাং। তিনি বলেন, ‘কত কারখানা বন্ধ হচ্ছে তা স্পষ্ট নয়। তবে চীনের উৎপাদন খাতের পুনর্বিন্যাস একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যাবে এবং এতে বলি হবে কর্মীরাই।’

এদিকে শেনজেন ও ডংগুয়ানের মতো বড় প্রযুক্তি কোম্পানির কারখানা রয়েছে এবং রফতানিনির্ভর শহরগুলোয় এরই মধ্যে বৈদেশিক বাণিজ্য স্থিতিশীল রাখতে বিভিন্ন সহায়তা কর্মসূচি চালু করেছে। শেনজেন গত সপ্তাহে বাণিজ্য মেলায় আসা বিদেশী কোম্পানিকে ভর্তুকি দেয়ার ঘোষণা দিয়েছে এবং বাতিল হওয়া মার্কিন ক্রয়াদেশ ক্ষতি পুষিয়ে নিতে রফতানি বীমা সম্প্রসারণের কথাও বলেছে।

নিংবো তাইইউন ইলেকট্রিকের একজন ম্যানেজার জানান, তারা ১২ এপ্রিল উৎপাদন স্থগিত করেছিলেন, কিন্তু পরে ইউরোপের কিছু ক্রয়াদেশ থাকায় হেয়ার স্ট্রেইটনার ও কার্লিং আয়রনের উৎপাদন সীমিত আকারে শুরু হয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের এখনো কিছু ইউরোপীয় ক্রয়াদেশ রয়েছে, আরো পাওয়ার চেষ্টা করছি। আশা করছি যুক্তরাষ্ট্র তাদের নীতি পরিবর্তন করবে।’

গত বছর প্রায় ১ ট্রিলিয়ন বা ১ লাখ কোটি ডলারের রেকর্ড বাণিজ্য উদ্বৃত্ত অর্জন করেছে চীন। দেশটি দফায় দফায় বাড়া শুল্কের প্রতিক্রিয়ায় মার্কিন আমদানির ওপর অতিরিক্ত ১২৫ শতাংশ শুল্ক আরোপ করেছে। ট্রাম্প জানিয়েছেন, বাণিজ্য ইস্যু সমাধানের জন্য চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে কথা বলতে চান তিনি । তবে অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, বেইজিং এ মুহূর্তে দুই নেতার মধ্যে ফোনালাপের বিষয়ে আগ্রহী নয়।

আরও